বিশাল সব বিল্ডিং তৈরি হয় ইট দিয়ে। বিল্ডিং কঠিন পদার্থ, কারণ ইটও কঠিন পদার্থ। বড় ও ছোটর এই যে কাঠিন্য, এটা কি কণাদের বেলাতেও খাটে?
একটি ইট ভাঙলে একসময় আমরা পরমাণু পাব। অর্থাৎ ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন পরমাণু দিয়ে তৈরি হয় একটি ইট। তাহলে ইটের মতো পরমাণুও কি কঠিন পদার্থ?
Visit betsport.cv for more information.
শুধু ইটের কথাই বা বলি কেন; সোনা, রুপা, এমনকি পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন পদার্থ হীরাসহ আমাদের চারপাশে যা কিছু আছে, সবই কোনো না কোনো পরমাণু দিয়ে তৈরি। তাহলে কি পরমাণুও কঠিন পদার্থ?
পরমাণু, এমনকি ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রনের মতো খুদে কণারা বস্তুকণা; এদের ভর আছে। আর ভর আছে বলে এদের একটা আকারও আমরা কল্পনা করে নিই। যার নির্দিষ্ট আকার আছে, তাকে আমরা কঠিন বলেই ধরে নিই।
পরমাণু, এমনকি ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রনের মতো খুদে কণারা বস্তুকণা; এদের ভর আছে
আসলেই কি তা-ই?
আমরা বিষয়টিকে চিরায়ত বলবিদ্যার কষ্টিপাথরে যাচাই করে দেখি। ‘বিন্দু থেকে সিন্ধু’ বলে একটি প্রবাদ আছে। বিন্দু বিন্দু পানি জড়ো হয়ে বিশাল সমুদ্র তৈরি হয়। তাই বলে কি এক বিন্দু পানিকে আমরা সমুদ্র বলতে পারি? পারি না। কিন্তু সমুদ্রের পানি যেমন তরল, তেমনি এক ফোঁটা পানিও তরল। তবে পরমাণুদের ক্ষেত্রে এ ব্যাপারটা খাটে না।
মোটা দাগে পদার্থের তিনটি অবস্থা—কঠিন, তরল ও বায়বীয়। বস্তু কঠিন, তরল নাকি বায়বীয় হবে, সেটা নির্ভর করে বস্তুর প্রকৃতি এবং পরিবেশের তাপমাত্রা ও চাপের ওপর। সাধারণ তাপমাত্রা ও চাপে সোনা, রুপা, লোহা ইত্যাদি কঠিন পদার্থ। পানি বা তেল তরল। অক্সিজেন, হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেনসহ সব ধরনের প্রাকৃতিক গ্যাস বায়বীয়।
পরমাণু খুঁড়তে গিয়েমোটা দাগে পদার্থের তিনটি অবস্থা—কঠিন, তরল ও বায়বীয়। বস্তু কঠিন, তরল নাকি বায়বীয় হবে, সেটা নির্ভর করে বস্তুর প্রকৃতি এবং পরিবেশের তাপমাত্রা ও চাপের ওপর।
বস্তু কখন কঠিন হয়? পরমাণুগুলোর মধ্যে যদি শক্তিশালী রাসায়নিক ও বৈদ্যুতিক বন্ধন তৈরি হয়, তখন পরমাণুগুলো খুব কাছাকাছি থাকে। এদের মধ্যে তখন ফাঁক থাকে না বললেই চলে। বস্তু তখন কঠিন পদার্থে রূপ নেয়।
কঠিন পদার্থে তাপ প্রয়োগ করলে কিংবা চাপ কমিয়ে নিলে পরমাণুগুলোর মধ্যে রাসায়নিক বন্ধন ভেঙে যায়। বস্তু তখন তরলে রূপান্তরিত হয়। তরলে আরও বেশি তাপ প্রয়োগ করলে কিংবা তার চারপাশ থেকে চাপ আরও কমিয়ে নিলে তরল পদার্থ বাষ্পে রূপান্তরিত হয়।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার; কঠিন, তরল বা বায়বীয়—এ সবই বস্তু বা পরমাণুদের সামষ্টিক রূপ। অর্থাৎ একসঙ্গে অনেক পরমাণু খুব কাছাকাছি থাকলেই কেবল বস্তু কঠিন পদার্থে রূপ নেবে। সামান্য দূরত্ব তৈরি হলে পরিণত হবে তরলে, দূরত্ব খুব বেশি হলে বায়বীয়। অর্থাৎ চিরায়ত বলবিদ্যার নীতি অনুযায়ী ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন পরমাণু একত্রিত হয়েই কেবল কঠিন, তরল বা বায়বীয় অবস্থা তৈরি করতে পারে। একটি একক পরমাণুর পক্ষে সেটা অসম্ভব।
তরল ও গ্যাসীয় পদার্থের পরমাণুগুলোর মধ্যে আন্তআণবিক বল ক্রিয়া করে
রাসায়নিক বন্ধন তৈরি হওয়ার মতো কোনো সঙ্গী নেই বলে একক পরমাণুর পক্ষে কঠিন পদার্থ হওয়া অসম্ভব। আবার তরল ও গ্যাসীয় পদার্থের পরমাণুগুলোর মধ্যে আন্তআণবিক বল ক্রিয়া করে। তাই দূরে থাকলেও তাদের মধ্যে কিছুটা পারস্পরিক আকর্ষণ থাকে। একটি সিঙ্গেল পরমাণুর সে সুযোগ নেই।
ধরা যাক, স্বর্ণের একটি পরমাণু নিয়ে আপনি গবেষণা করছেন। দেখবেন, স্বর্ণের প্রায় সব ধর্ম ও বৈশিষ্ট্য এতে বজায় আছে। শুধু কঠিন, তরল ও বায়বীয় অবস্থার মতো বাহ্যিক ধর্ম একক পরমাণু ধারণ করে না। কারণ, বস্তুর বাহ্যিক অবস্থা কেমন হবে তা নির্ভর করে তাপমাত্রা ও চাপের ওপর। কিন্তু সে জন্য একাধিক অর্থাৎ প্রচুর পরমাণুর দরকার হয়।
মানুষের শরীরে কয়টি পরমাণু আছেরাসায়নিক বন্ধন তৈরি হওয়ার মতো কোনো সঙ্গী নেই বলে একক পরমাণুর পক্ষে কঠিন পদার্থ হওয়া অসম্ভব। আবার তরল ও গ্যাসীয় পদার্থের পরমাণুগুলোর মধ্যে আন্তআণবিক বল ক্রিয়া করে।
কোয়ান্টাম মেকানিকসের চোখে পরমাণু
এ বিষয়ে কোয়ান্টাম মেকানিকস কী বলে? পরমাণু আসলে কোন অবস্থায় থাকে?
এ বিষয়ে চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিখ্যাত মার্কিন তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী শন ক্যারল। তিনি বলেন, ‘দৈনন্দিন জীবনে পদার্থের যে তিনটি অবস্থা দেখা যায়, সেগুলো চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মে বাঁধা। পরমাণুর মতো খুদে কণাদের জগতে এই নিয়ম অচল।’
কণাদের কোয়ান্টাম আচরণ কখনো চিরায়ত নীতি মেনে চলে না
লাখো-কোটি পরমাণুর সমাবেশে বিশাল আকারের একটি বস্তু তৈরি হয় বটে, কিন্তু সেই বস্তুর বিল্ডিং ব্লক পরমাণুর কাজকারবার নিয়ন্ত্রণ করে কোয়ান্টাম মেকানিকস। আর কণাদের কোয়ান্টাম আচরণ কখনো চিরায়ত নীতি মেনে চলে না। শন ক্যারল আরও একধাপ এগিয়ে বলেছেন, ‘একটি উপন্যাসের কথাই ধরুন। যেকোনো উপন্যাসে একটি বিশাল কলেবরের গল্প থাকে। কিন্তু সেই উপন্যাস গড়ে ওঠে হাজার হাজার শব্দ যোগ করে। তবে কোনো একটি শব্দ যদি আপনি আলাদা করে বেছে নেন, সেটা কোনো গল্প বলে না। তেমনি কঠিন, তরল বা বায়বীয় হলো কোটি কোটি পরমাণুর যৌথ অবস্থা। এই অবস্থা কখনোই একটি পরমাণুতে পাওয়া সম্ভব নয়।’
পরমাণু কি স্পর্শ করা যায়মার্কিন তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী শন ক্যারল বলেন, ‘দৈনন্দিন জীবনে পদার্থের যে তিনটি অবস্থা দেখা যায়, সেগুলো চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মে বাঁধা। পরমাণুর মতো খুদে কণাদের জগতে এই নিয়ম অচল।’
পরমাণু সম্পর্কে আমাদের মনে একটি গোলাকার মার্বেলের মতো বস্তুর ছবি আঁকা আছে। একই কথা ইলেকট্রন, কোয়ার্ক, প্রোটন বা নিউট্রনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যুগ যুগ ধরে মনে গেঁথে যাওয়া এই ছবি একেবারে গুঁড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। বৈজ্ঞানিক উপমা ও উদাহরণে পরমাণুকে গোলাকার হিসেবে উপস্থাপন করেন বিশুদ্ধবাদী বিজ্ঞানীরাও। এতে বোঝানো সহজ হয়। আর তাই আমরা ধরে নিই, পরমাণু বা খুদে কণারা হয়তো গোলাকার। এই ধারণায় কুঠারাঘাত করেছেন কোয়ান্টাম বলবিদ্যার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা জার্মান পদার্থবিদ ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ। কোয়ান্টাম বলবিদ্যার প্রধান ভিত্তি হলো অনিশ্চয়তা নীতি। সেই নীতিরই রূপকার তিনি। পরমাণুর আকার সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘পরমাণু কোনো বাস্তব বস্তু নয়, প্রতিটা পরমাণুই আসলে একেকটি সম্ভাবনা। আমাদের চিরচেনা জগতের কাণ্ডজ্ঞান দিয়ে পরমাণুকে সংজ্ঞায়িত করা অসম্ভব। এটা কঠিনও নয়, তরলও নয়। শুধু কিছু গাণিতিক সূত্রের মাধ্যমেই পরমাণুকে বোঝা সম্ভব।’
আমরা ধরে নিই, পরমাণু বা খুদে কণারা হয়তো গোলাকার!
পরমাণুর নিজস্ব অবস্থা নেই বটে, তবু বিজ্ঞানীরা একক পরমাণু নিয়ে গবেষণা করেন হরহামেশা। এ যুগে পরমাণুকে উন্নত লেজার রশ্মির সাহায্যে এক জায়গায় আটকে রাখা যায়। অত্যন্ত শীতল তাপমাত্রায়, অর্থাৎ পরম শূন্য তাপমাত্রার কাছাকাছি এনে পরমাণুর গতি প্রায় থামিয়ে দেওয়া সম্ভব। বিজ্ঞানীরা সেটা করেও দেখেছেন। এই অবস্থায় পরমাণুর আচরণ আরও অদ্ভুত হয়ে ওঠে। তখন এরা তরল বা বায়বীয় অবস্থায় থাকে না, তখন এদের কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়। এ অবস্থায় এরা তরঙ্গের মতো আচরণ করে, পরমাণুর অবস্থান আর নির্দিষ্ট থাকে না। সে একই সঙ্গে একাধিক জায়গায় তরঙ্গ আকারে ছড়িয়ে পড়ে। বিজ্ঞানের এই অবস্থাকে বলা হয় বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট। এটি পদার্থের পঞ্চম অবস্থা হিসেবে পরিচিত।
পরমাণু আসে কোথা থেকেএ যুগে পরমাণুকে উন্নত লেজার রশ্মির সাহায্যে এক জায়গায় আটকে রাখা যায়। অত্যন্ত শীতল তাপমাত্রায়, অর্থাৎ পরম শূন্য তাপমাত্রার কাছাকাছি এনে পরমাণুর গতি প্রায় থামিয়ে দেওয়া সম্ভব।
ব্রিটেনের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষক ভ্লাটকো ভেড্রাল বলেন, ‘অনেকেই মনে করে পরমাণু ছোট মার্বেলের মতো শক্তপোক্ত কোনো কণা। কিন্তু কোয়ান্টাম মেকানিকস বলে এটা ওই ধরনের কণা নয়। পরমাণু শক্তির প্যাকেট বা তরঙ্গ আকারে থাকে। শক্তি কখনো কঠিন বা তরল হতে পারে না। কঠিন বস্তুও আসলে শক্তির বিশেষ এক বিন্যাস। তরল ও বায়বীয় আরেক ধরনের শক্তি বিন্যাস। তাই পরমাণু নিজে এই তিন অবস্থার কোনোটির মধ্যেই পড়ে না। বরং বহু পরমাণু মিলে বিভিন্নভাবে শক্তি বিন্যাস করে অবস্থার জন্ম দেয়।’
ভেড্রালের এই মন্তব্যের সত্যতা লুকিয়ে আছে আইনস্টাইনের বিখ্যাত ভর-শক্তির সমীকরণে: E=mc2। এই সূত্র বলে, বস্তুর ভর আর শক্তির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। ভর থেকে যেমন বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপাদন করা যায়, তেমনি শক্তিকে ভরে পরিণত করা সম্ভব। প্রযুক্তিগত দিক থেকে শক্তিকে ভরে পরিণত করার ব্যাপারটা মানুষের জন্য ভীষণ কঠিন বটে, কিন্তু প্রকৃতির জন্য সেটা কঠিন নয়। শক্তি ও তরঙ্গের নানা রকম প্যাকেট সাজিয়ে তৈরি হয়েছে নানা ধরনের কণা। পরমাণু, ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন ও কোয়ার্কের মতো ভরযুক্ত কণারা শক্তির নানা রকম বিন্যাস থেকে জন্ম নেয়। তাই ক্লাসিক্যাল মেকানিকসের স্থূল ও বাহ্যিক অবস্থা এদের জন্য প্রযোজ্য নয়। অর্থাৎ পরমাণুকে কঠিন, তরল বা বায়বীয় কোনোটার কাতারেই ফেলা যায় না।
লেখক: সাংবাদিকসূত্র: নিউ সায়েন্টিস্ট
দৃশ্যমান মহাবিশ্বে কয়টি পরমাণু আছে Read full story at source