একটি টুইট, রোনালদো আর ইউস্টাকিওর গল্প
· Prothom Alo
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ভক্তরা হয়তো খেপে যেতে পারেন। খোঁচা বলে কথা। তবে অন্যদের জন্য টুইটটা বেশ মজার।
বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে গোল করলেন স্টিফেন ইউস্টাকিও। সেই গোলে জিতে কানাডা উঠে গেল বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয়। ২৯ বছর বয়সী ইউস্টাকিওকে এই ম্যাচের আগে খুব বেশি মানুষ চেনার কথা নয়। আর এ ধরনের হঠাৎ আলোচনায় চলে এলে অনেকেই তাঁকে জার্সি নম্বর দিয়ে চিনে নেন।
Visit newsbetting.club for more information.
ইউস্টাকিওর জার্সি নম্বর ৭। আর সেটিই তুলে ধরে দ্য অ্যাথলেটিকের কলিন মিলার লিখলেন, ‘ইউস্টাকিও পর্তুগালকে প্রতিনিধিত্ব করা প্রথম ৭ নম্বর জার্সিধারী ফুটবলার, যিনি বিশ্বকাপের নকআউটে গোল করলেন!’
পর্তুগাল, ৭ নম্বর জার্সি, বিশ্বকাপের নকআউটে গোল—এই তিনটি ‘ট্যাগ’ এক করলে যে কারও মনে ভেসে উঠবে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর চেহারা। ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার অবিশ্বাস্য রেকর্ড তাঁর। কিন্তু বিশ্বকাপে রোনালদোর দশটি গোলের সব কটিই গ্রুপ পর্বের। নকআউটে শূন্য। পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ীর অপূর্ণতার সেই তথ্যই নতুন করে সামনে এল কানাডার ৭ নম্বর ইউস্টাকিওর কারণে।
টুইটটা অবশ্য শুধু জার্সি নম্বরের গল্প নয়। এর পেছনে আছে আরেকটা গল্প।
ইউস্টাকিওর জন্ম কানাডাতেই। তবে মা–বাবা পর্তুগিজ। সাত বছর বয়সে পর্তুগালে ফিরেও গিয়েছিলেন। অন্টারিওতে জন্ম নেওয়া ছেলেটির বেড়ে ওঠা পর্তুগালের নাজারায়। ফুটবলে হাতেখড়িও সেখানকার ক্লাব ওস নাজারেনোসে, এরপর ধাপে ধাপে পর্তুগিজ ফুটবলের একাডেমিতে উঠে আসা। তবে ফুটবলার হিসেবে পর্তুগালে বেড়ে উঠলেও পাসপোর্টে লেখা ছিল ‘কানাডা’।
দুই দেশের পরিচয় নিয়ে বড় হওয়া মানুষের সামনে একসময় একটি প্রশ্ন এসেই দাঁড়ায়—শেষ পর্যন্ত কোন পতাকার নিচে দাঁড়াবেন?
ইউস্টাকিও–ও সেই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন। প্রথমে কানাডার হয়ে যুব পর্যায়ে খেললেন। পরে ২০১৭ সালে ডাক পেলেন পর্তুগালের অনূর্ধ্ব–১৯ দলে। সাতটি ম্যাচও খেললেন। তখন তাঁকে দেখলে মনে হতো, একদিন হয়তো রোনালদোর সঙ্গে দেশের জার্সি গায়েই বিশ্বমঞ্চে নামবেন।
কিন্তু ২০১৯ সালে হিসাবটা বদলে গেল। ইউস্টাকিও বেছে নিলেন কানাডাকে। পর্তুগালের হয়ে ক্যারিয়ার গড়লেও সেখানকার মিডফিল্ডে জায়গা পাওয়ার লড়াই ছিল কঠিন। বরং কানাডায় খেললে সুযোগটা মিলবে। তবে হিসাবটা শুধু ফুটবলীয় ছিল না। যে দেশ তাঁকে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছে, সেই দেশেরও একজন হয়ে উঠতে চেয়েছিলেন ইউস্টাকিও।
পথটা অবশ্য মোটেও সরল ছিল না।
যে শটে ইতিহাস গড়েছেন স্টিফেন ইউস্টাকিওমাঝে কিছুদিনের জন্য মেক্সিকোর লিগে গেলেও ক্লাব ফুটবলে শেষ পর্যন্ত থিতু হন পর্তুগালেই। পোর্তোতে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন, এ বছরের শুরুতে পাড়ি জমান মেজর লিগ সকারে। তবে ক্যারিয়ারের এই সময়টাতেই ব্যক্তিগত জীবনে নেমে আসে দুটি বড় আঘাত। ২০২৩ সালের এপ্রিলে পোর্তোর এক ম্যাচের বিরতিতে তিনি জানতে পারেন, ব্রেন ক্যানসারে মারা গেছেন তাঁর মা এজমেরালদা। এর মাত্র ১৩ মাস পর, ২০২৪ সালের মে মাসে হৃদ্রোগে মারা যান বাবা আর্মান্দোও।
যে মা–বাবা অভিবাসী হয়ে কানাডায় গিয়েছিলেন, যাঁদের কারণে ইউস্টাকিওর জীবনে দুই দেশের পরিচয় তৈরি হয়েছিল, তাঁদের দুজনকেই হারালেন মাত্র ১৩ মাসের ব্যবধানে।
তারপর এল ২০২৬ সালের ২৮ জুন।
লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফি স্টেডিয়ামে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচ। দক্ষিণ আফ্রিকার রক্ষণাত্মক ফুটবলের দরুণ ম্যাচ অতিরিক্ত আধা ঘণ্টায় গড়ানো অনেকটাই নিশ্চিত। এমন পরিস্থিতিতেই মোড় ঘুরিয়ে দিলেন তিনি। যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে অ্যালিস্টার জনস্টনের ক্রস দক্ষিণ আফ্রিকার এক ডিফেন্ডার হেডে বক্সের বাইরে পাঠিয়ে দিলে এসে পড়ে ইউস্টাকিওর সামনে। বুক দিয়ে নামিয়ে একমুহূর্ত দেরি না করে নিচু শটে বল পাঠিয়ে দেন জালে।
মুহূর্তেই লেখা হলো বিশ্বকাপে কানাডার নতুন ইতিহাস। প্রথমবারের মতো নকআউটে খেলে জয়, সেই সঙ্গে প্রথমবার শেষ ষোলোর টিকিটও। একজন পর্তুগিজ উত্তরাধিকার বহনকারী হয়ে উঠলেন কানাডিয়ানদের স্বপ্নপূরণের নায়ক।
গোলের পর ইউস্টাকিওম্যাচের শেষ বাঁশির পর কানাডার ইতিহাস বদলে দেওয়া সেই মুহূর্তটির কথা যখন জিজ্ঞেস করা হলো তাঁকে, উত্তরটা দিয়েছেন এভাবে—‘আমার মনে হচ্ছিল যেন সবাই আমার সঙ্গে শটটি নিচ্ছে। সবাই যেন শটটিতে একটু একটু করে শক্তি যোগ করে দিচ্ছে। এরপরই বলটা জালে জড়িয়ে গেল।’
ইউস্টাকিওর ওই শক্তিতে হয়তো তাঁর মা–বাবাও ছিলেন। তাই তো ম্যাচ জেতানো গোলটির অর্থ তাঁর কাছে কী জানতে চাওয়া হলে কিছুটা যেন স্মৃতির স্মরণীও ঘুরে এলেন, ‘আমি যা কিছু করি, সব আমার পরিবারের জন্য—মা–বাবার জন্য, আমার মেয়ের জন্য, আমার ভাইয়ের জন্য, বন্ধুদের জন্য। সবার জন্য।’
বিশ্বকাপে রোনালদোর ৭ নম্বর জার্সির যে গল্পটা এখনও অপূর্ণ, তার পাশে কানাডার ৭ নম্বর জার্সিতে ইউস্টাকিওর গল্পটা একটু ভিন্নই। যে গল্পে আছে দুই দেশের পরিচয়, অভিবাসী এক পরিবারের স্বপ্ন, মা–বাবার স্মৃতি আর ইতিহাস গড়া এক গোল।
বাবার দেশকে কাঁদিয়ে ছেলের বিশ্বকাপ-রূপকথা