Mouz

শ্রীমঙ্গলে এত বৃষ্টি হয় কেন

· Prothom Alo

জুন মাসে শ্রীমঙ্গলে গেলে একটা জিনিস টের পাওয়া যায়—মেঘ যেন সরে না। ঢাকায় তখন হয়তো রোদ, ওখানে বৃষ্টি। পরদিনও বৃষ্টি, তার পরদিনও তাই। এটি কোনো কাকতালীয় ব্যাপার নয়, জায়গাটার একটা নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে।

বাংলাদেশে বছরে গড়ে আড়াই হাজার মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। শ্রীমঙ্গলে সেটি পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে যায়। কোনো কোনো বছর আরও বেশি। দেশের বাকি জায়গার প্রায় দ্বিগুণ। শুধু এখানে কেন, এই প্রশ্নের উত্তরটা আসলে লুকিয়ে আছে তিনটি জিনিসে; সাগর, পাহাড় ও দুটির মাঝখানে শ্রীমঙ্গলের অবস্থান।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

বর্ষায় বঙ্গোপসাগর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু ওঠে। এই বায়ু ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি দিয়ে প্রবাহিত হয়, সাগরের ওপর দিয়ে আসার সময় প্রচুর জলীয় বাষ্প টেনে নেয়। উপকূল পেরিয়ে সেই বায়ু উত্তর-পূর্বে এগোতে থাকে। সমতল বাংলাদেশে কোনো বাধা নেই, তাই বাতাস সরাসরি এগোয়। মাঝেমধ্যে বৃষ্টি হয়, কিন্তু বড় কিছু ঘটে না। ঘটে শ্রীমঙ্গলের কাছে এসে।

শ্রীমঙ্গলের উত্তর সীমান্ত ঘেঁষে মেঘালয়। সেখানে খাসিয়া, জয়ন্তিয়া ও গারো পাহাড়ের একটি মালভূমি হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেছে—সমতল থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার উঁচু। দক্ষিণ ঢালটা প্রায় খাড়া। সাগর থেকে আসা ভেজা বাতাস এই পাহাড়ে ধাক্কা খেলে ওপরে উঠতে বাধ্য হয়। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে অরোগ্রাফিক লিফট।

বৃষ্টি ও দুর্যোগের দিনে যেভাবে জীবন বাঁচাতে পারে প্রযুক্তি
একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় এসে বাষ্প ঘনীভূত হতে শুরু করে। এই বিন্দুটাকে বলে ডিউ পয়েন্ট বা শিশিরাঙ্ক। ঘনীভূত হলে জলকণা তৈরি হয়, জলকণা জমা হলে হয় মেঘ। মেঘ ভারী হলে বৃষ্টি হয়।

এই অরোগ্রাফিক লিফটের ভেতরে কী হয়, সেটা একটু বোঝা দরকার। বাতাস যখন ওপরে ওঠে, তখন চারদিকের বায়ুচাপ কমতে থাকে। চাপ কমলে বাতাস প্রসারিত হয়, আর প্রসারিত হলে তাপমাত্রা কমে। এই ঠান্ডা হওয়াটাকে বলে অ্যাডিয়াবেটিক কুলিং। প্রতি ১০০ মিটার উচ্চতায় বাতাসের তাপমাত্রা প্রায় এক ডিগ্রি সেলসিয়াস করে কমে। দেড় কিলোমিটার উঠতে উঠতে তাপমাত্রা নেমে যায় ১৫ ডিগ্রির মতো।

ঠান্ডা বাতাস জলীয় বাষ্প ধরে রাখতে পারে না। একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় এসে বাষ্প ঘনীভূত হতে শুরু করে। এই বিন্দুটাকে বলে ডিউ পয়েন্ট বা শিশিরাঙ্ক। ঘনীভূত হলে জলকণা তৈরি হয়, জলকণা জমা হলে হয় মেঘ। মেঘ ভারী হলে বৃষ্টি হয়। শ্রীমঙ্গল থেকে তাকালে মাঝেমধ্যে দেখা যায় উত্তরের পাহাড়ের গায়ে মেঘ আটকে আছে। ওটা আসলে এই প্রক্রিয়াটাই চোখে দেখা যাচ্ছে।

তবে শুধু উঁচু পাহাড় থাকলেই এত বৃষ্টি হতো না। খাসিয়া-জয়ন্তিয়া পাহাড়ের বিন্যাসটা আলাদা। মৌসুমি বাতাস দক্ষিণ থেকে আসে, আর পাহাড়গুলো সেই দিকে লম্বভাবে দাঁড়িয়ে—মানে পুরো মালভূমিটা একটি দেয়ালের মতো বাতাসের সামনে পড়ে। শুধু তা-ই নয়, পাহাড়ের গায়ে কয়েকটি গিরিখাত আছে, যেগুলো দক্ষিণ থেকে উত্তরে গেছে। বাতাস সেই খাত দিয়ে ঢুকতে গিয়ে সংকুচিত হয়, গতি বাড়ে। দ্রুত ওপরে ওঠে, দ্রুত ঠান্ডা হয়, বেশি বৃষ্টি হয়। পুরো ব্যবস্থাটা অনেকটা ফানেলের মতো কাজ করে। শ্রীমঙ্গল সেই ফানেলের মুখে অবস্থিত।

চেরাপুঞ্জির নাম অনেকেই জানেন। সীমান্তের ওপারে, মেঘালয়ে। বছরে গড়ে প্রায় ১১ হাজার মিলিমিটার বৃষ্টি হয় সেখানে। ১৮৬১ সালে এক বছরে পড়েছিল ২৬ হাজার মিলিমিটারের বেশি, যা এখনো রেকর্ড। কিন্তু সেই মেঘ চেরাপুঞ্জিতে জন্মায় না। জন্মায় বঙ্গোপসাগরে। শ্রীমঙ্গলের আকাশ পেরিয়ে পাহাড়ে ধাক্কা খায়। যাওয়ার পথে কিছুটা এখানেও পড়ে।

বৃষ্টি পড়লে গাড়ির জানালায় বাষ্প জমে কেন?
শ্রীমঙ্গলে প্রায় ১৮৪ বর্গকিলোমিটার জুড়ে চা-বাগান। এই বিশাল সবুজ আচ্ছাদন মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখে, বাষ্পীভবন বাড়ায়, স্থানীয় বাতাসকে আর্দ্র রাখে।

শুধু শ্রীমঙ্গল নয়, পুরো উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশটাই এ কারণে বৃষ্টিবহুল। সিলেটে বছরে গড়ে ৪ হাজার ১৮০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। সুনামগঞ্জে ৫ হাজার ৩০০ মিলিমিটারের বেশি। লালাখালে ৬ হাজার ৪০০ মিলিমিটার—যা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ। পাহাড় আর সাগরের বায়ু মিলে পুরো করিডরটিকে একটি স্থায়ী বৃষ্টির এলাকা করে রেখেছে। শ্রীমঙ্গল সেই করিডরে একটু বেশি সুবিধাজনক জায়গায় অবস্থিত।

আরেকটা ব্যাপার কাজ করে—স্থানীয় বনভূমি ও চা-বাগান। শ্রীমঙ্গলে প্রায় ১৮৪ বর্গকিলোমিটার জুড়ে চা-বাগান। এই বিশাল সবুজ আচ্ছাদন মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখে, বাষ্পীভবন বাড়ায়, স্থানীয় বাতাসকে আর্দ্র রাখে। এটি মূল কারণ নয়, কিন্তু বৃষ্টির পরিবেশটাকে টিকিয়ে রাখতে এর ভূমিকা রয়েছে।

শ্রীমঙ্গলে প্রায় ১৮৪ বর্গকিলোমিটার জুড়ে চা-বাগান

ব্রিটিশরা যখন এই অঞ্চলে চা চাষ শুরু করেছিল, তখন জায়গা বেছেছিল হিসাব করে। চা-গাছের জন্য দরকার নির্দিষ্ট তাপমাত্রা, অম্লীয় মাটি, আর সবচেয়ে জরুরি—নিয়মিত প্রচুর বৃষ্টি। শ্রীমঙ্গলে তিনটাই ছিল। মেঘালয়ের পাহাড় ও বঙ্গোপসাগরের বায়ু মিলে যে ব্যবস্থাটা তৈরি করেছে, সেটা এখানকার মাটি, ফসল, বন—সবকিছুর নেপথ্যে কাজ করছে। শ্রীমঙ্গল আজ যা আছে, তার পেছনে এই বৃষ্টিটাই মূল কারণ।

লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সূত্র: সায়েন্স ইনসাইটসবৃষ্টি বা পানির ফোঁটা গোল কেন?

Read full story at source

AI-powered Siri is on the way – but is it worth using?

· The Age

Data centres vow to fund Australia’s renewables shift, not derail it

· Brisbane Times