রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেন এলাকার প্রবাসীকল্যাণ ভবনের একটি তলায় মধ্যবয়সী এক ব্যক্তি হাঁটাহাঁটি করছিলেন। বিষণ্ন চেহারা। পরিচয় দিয়ে কথা বললে তিনি জানালেন, তাঁর শ্বশুর পিরোজপুরের ইন্দুরকানি উপজেলার একটি দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে অবসরে যান। ওই বছরের জুনে অবসর ও কল্যাণসুবিধার জন্য আবেদন করেন। কিন্তু ২০২৪ সালের এপ্রিলে তিনি মারা যান। এখন তিনি এসেছেন তাঁর শ্বশুরের মৃত্যুসনদ জমা দিতে। তিনি নিজেও রাজধানীর একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক।
Visit mchezo.life for more information.
টাকার প্রয়োজনীয়তার কথা বলতে গিয়ে ওই ব্যক্তি বললেন, শ্বশুরের চার মেয়ে। শাশুড়িও বৃদ্ধ মানুষ। একপর্যায়ে একজন কর্মকর্তার কক্ষে গিয়ে তিনি কেঁদেই ফেলেন।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। হাজার হাজার এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীর জীবনের বাস্তবতা এখন এমনই। কেউ অবসরের পর মাসের পর মাস ঘুরছেন, কেউ বছরের পর বছর অপেক্ষা করছেন। আবার কেউ কেউ নিজের প্রাপ্য টাকা হাতে পাওয়ার আগেই মারা গেছেন। সারা জীবন শিক্ষাসেবা দিয়ে অবসরে গিয়ে নিজের প্রাপ্য টাকার জন্য এমন অসহায় অপেক্ষা শিক্ষকসমাজে গভীর হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি করেছে।
তবে টাকার পরিমাণ তুলনামূলক কম হওয়ায় কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা পেতে কিছুটা কম অপেক্ষা করতে হয়। ট্রাস্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০২৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত আবেদনকারীরা কল্যাণসুবিধার টাকা পেয়েছেন। এরপর ২৪ মে পর্যন্ত ৪৪ হাজার ৯৬৬ জন শিক্ষক-কর্মচারীর আবেদন অনিষ্পন্ন অবস্থায় পড়ে আছে।
সরকার বদলায়, শিক্ষকদের অপেক্ষা কমে না
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসরসুবিধা বোর্ড এবং কল্যাণ ট্রাস্ট এখন হাজারো অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীর দীর্ঘশ্বাসের জায়গা হয়ে উঠেছে। সরকার বদলায়, নানা খাতে বড় বড় প্রকল্প হয়, কিন্তু শিক্ষকদের এ সমস্যার সমাধান হয় না। অভিযোগ রয়েছে, অন্য খাতে অর্থ ব্যয়ে উদারতা থাকলেও শিক্ষকদের ন্যায্য পাওনা দেওয়ার প্রশ্নে বারবার বলা হয়—তহবিল নেই, টাকা নেই।
অথচ শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণসুবিধা সময়মতো নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলেই মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। উচ্চ আদালতের নির্দেশও রয়েছে, শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসরসুবিধার টাকা ছয় মাসের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে সেই নির্দেশও মানা হচ্ছে না।
অবসরসুবিধা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আবেদন করা শিক্ষক-কর্মচারীরা অবসরসুবিধার টাকা পেয়েছেন। এর পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬৪ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী আবেদন করলেও টাকা পাননি।
অবসরসুবিধা বোর্ডের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানান, এখন ২০২২ সালের মে মাস পর্যন্ত জমা পড়া আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এর মধ্যে আবার সফটওয়্যার-সংক্রান্ত সমস্যার কারণে টাকা দেওয়া অনেক দিন ধরে বন্ধ রয়েছে।
তবে টাকার পরিমাণ তুলনামূলক কম হওয়ায় কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা পেতে কিছুটা কম অপেক্ষা করতে হয়। ট্রাস্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০২৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত আবেদনকারীরা কল্যাণসুবিধার টাকা পেয়েছেন। এরপর ২৪ মে পর্যন্ত ৪৪ হাজার ৯৬৬ জন শিক্ষক-কর্মচারীর আবেদন অনিষ্পন্ন অবস্থায় পড়ে আছে।
কেউ অবসরের পর মাসের পর মাস ঘুরছেন, কেউ বছরের পর বছর অপেক্ষা করছেন। আবার কেউ কেউ নিজের প্রাপ্য টাকা হাতে পাওয়ার আগেই মারা গেছেন। সারা জীবন শিক্ষাসেবা দিয়ে অবসরে গিয়ে নিজের প্রাপ্য টাকার জন্য এমন অসহায় অপেক্ষা শিক্ষকসমাজে গভীর হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি করেছে।
টাকা পেতে গলদঘর্ম শিক্ষকেরা
সারা দেশে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ৬ লাখের বেশি। তাঁদের অবসর ও কল্যাণসুবিধা পরিচালিত হয় দুটি পৃথক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। কল্যাণসুবিধার টাকা দেয় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট। আর অবসরসুবিধার টাকা দেয় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসরসুবিধা বোর্ড।
এর আগে রাজধানীর নীলক্ষেত-পলাশী এলাকার ব্যানবেইস ভবনে এই দুই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চলত। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠান দুটি ইস্কাটন গার্ডেনের প্রবাসীকল্যাণ ভবনে স্থানান্তর করা হয়েছে। এ নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। কারণ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিস-সুবিধা বাড়লেও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের দুর্ভোগ কমেনি।
অবসরসুবিধার জন্য চাকরিকালীন শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতনের ৬ শতাংশ করে টাকা মাসে কেটে রাখা হয়। কল্যাণসুবিধার জন্য কাটা হয় আরও ৪ শতাংশ। এ ছাড়া প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বছরে ১০০ টাকা নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৭০ টাকা অবসরের জন্য এবং ৩০ টাকা কল্যাণের জন্য। বাকি অর্থ সরকার ও জমা অর্থের সুদ থেকে সমন্বয় করা হয়।
অর্থাৎ শিক্ষকেরা চাকরিজীবনে নিজেরাই নিয়মিত অর্থ জমা রাখছেন। কিন্তু অবসরে গিয়ে সেই টাকাই সময়মতো তুলতে পারছেন না।
অবসরসুবিধার জন্য চাকরিকালীন শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতনের ৬ শতাংশ করে টাকা মাসে কেটে রাখা হয়। কল্যাণসুবিধার জন্য কাটা হয় আরও ৪ শতাংশ। এ ছাড়া প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বছরে ১০০ টাকা নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৭০ টাকা অবসরের জন্য এবং ৩০ টাকা কল্যাণের জন্য। বাকি অর্থ সরকার ও জমা অর্থের সুদ থেকে সমন্বয় করা হয়।
ঘাটতি এখন বিপুল টাকা
অবসরসুবিধা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ৬ শতাংশ হারে টাকা কাটার মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রায় ৭৩ কোটি টাকা জমা হয়। এফডিআরের লভ্যাংশ আসে প্রায় ৩ কোটি টাকা। কিন্তু প্রতি মাসে যে পরিমাণ আবেদন জমা পড়ে, তা পরিশোধ করতে প্রয়োজন হয় গড়ে ১২৫ কোটি টাকা।
বর্তমানে জমে থাকা আবেদন অনুযায়ী অবসরসুবিধা খাতে ঘাটতি প্রায় সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা। আর কল্যাণ ট্রাস্টে ঘাটতি প্রায় ২ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২ হাজার ২০০ কোটি টাকার বন্ড দেওয়া হয়েছিল। ২ হাজার কোটি টাকা অবসরসুবিধার জন্য এবং ২০০ কোটি টাকা কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য। তবে এই বন্ডের মুনাফা ছয় মাস পরপর পাওয়া যাবে, যার পরিমাণ হবে ১৫০ থেকে ১৬০ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই অর্থসংকট সমাধানের জন্য অপ্রতুল। সরকারের সরাসরি আর্থিক সহায়তা ছাড়া এ সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। সরকারের পক্ষ থেকে এককালীন ঘাটতির টাকা পরিশোধ এবং এরপর প্রতি অর্থবছরের বাজেটে নির্ধারিত বরাদ্দ নিশ্চিত করা গেলে এই ভোগান্তির অবসান হতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২ হাজার ২০০ কোটি টাকার বন্ড দেওয়া হয়েছিল। ২ হাজার কোটি টাকা অবসরসুবিধার জন্য এবং ২০০ কোটি টাকা কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য। তবে এই বন্ডের মুনাফা ছয় মাস পরপর পাওয়া যাবে, যার পরিমাণ হবে ১৫০ থেকে ১৬০ কোটি টাকা।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অবসরসুবিধা বোর্ডের জন্য ৭ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা এবং কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য ২ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই অর্থ দেয়নি অর্থ মন্ত্রণালয়।
দীর্ঘ সময় ধরে অবসরসুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্ট পরিচালনার জন্য পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা বোর্ডও ছিল না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মাসের পর মাস এই বোর্ড গঠন না হওয়ায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়। তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সম্প্রতি পূর্ণাঙ্গ বোর্ড গঠন করা হয়েছে।
পদাধিকারবলে অবসরসুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব। তবে দুটি প্রতিষ্ঠান কার্যত পরিচালনা করেন অবসরসুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের দুজন সচিব।
জানতে চাইলে অবসরসুবিধা বোর্ডের নতুন সচিব মো. মোশাররফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, তিনি নিজেও সারা জীবন শিক্ষকতা করেছেন। তাই এ সমস্যা সমাধানে তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন।
Read full story at source